রানী পদ্মাবতীর চন্দ্রহার

রাজেশ্বরী জুয়েলার্স এর প্রোপাইটার রাজেন্দ্র আগারওয়াল বাবু ব্যাথাতুর মুখে লোলুপ দৃষ্টিতে একবার আমার দিকে আরেকবার রতন স্বর্ণকারের দিকে তাকাচ্ছেন।

অনেকক্ষন আমাকে চুপচাপ থাকতে দেখে হাত কচলাতে কচলাতে বললেন,  " আমি বলেছিলাম কি রায়বাহাদুর সাহেব এরোকম জিনিস আর তিনটে কোথাও পাবেন না, একবার ভেবে দেখুন দু, দুটো চন্দ্রহার এভাবে নষ্ট করা কি ঠিক হবে? আপনি চাইলে আমি এ দুটোর সমান সোনা আপনাকে মেপে দিচ্ছি অথবা  বাজার দর অনুযায়ী নগদ টাকা চান তো আপনাকে নগদ দিচ্ছি। তবুও আমাকে এ দুটো গলাতে বলবেন না প্লিজ। এ দুটো এভাবে নষ্ট করলে পাপ হবে। এ যে বড় অমূল্য জিনিস।"

হুকুমের অপেক্ষায় মাথায় কাঁচাপাকা উষ্কখুষ্ক চুল, পান খাওয়া মুখ হা করে রতন সেকরার একবার আমার দিকে আরেকবার মালিকের দিকে তাকাচ্ছে।

আমার মাথায় তখন চলতেছে অন্য হিসেব,
এই দুটো চন্দ্রহারের একটির জন্য আমার প্রপিতামহের বংস প্রায় নির্বংশ হয়েছিলো।
আর আজ আমার? কেউ নেই আমার মৃত্যুর পর ভিটেমাটিতে প্রদীপ জ্বালানোর।

আমি নরেন্দ্রনারায়ণ রায়বাহাদুর, আমার পিতা নগেন্দ্রনাথ রায়,তাঁর পিতা খগেন্দ্র নাথ রায়, তাঁর পিতা ছিলেন কৈলাশনারায়ন রায় বাহাদুর।

নামের আর উপাধির বহর দেখে নিশ্চই বুঝতে পারতেছেন আমি রায় বংশীয়।
আমি রায়বাহাদুর খেতাপ প্রাপ্ত নই, সেই ব্রিটিশ সময়ের বংশীয় জৌলুশ, রস বহু আগেই ফুরিয়ে গেছে ব্রিটিশ দের সাথে সাথেই। রয়ে গেছে শুধু বংশীয় গৌরব আর নাম গুলো। একে একে বংশীয় গৌরব ও তলানি তে টেকে গেলে আমি নামের সাথে রায়বাহাদুর লাগিয়ে তা রক্ষা করার শেষ চেস্টা করি!

আমার ঠাকুমা অহল্যা দেবী। শক্তপোক্ত নারী ছিলেন। যিনি একসময় একাই, এক হাতে গোটা পরিবার সামলিয়ে পিতৃহীন
আমার বাবা, পিসিদের মানুষ করেছিলেন,  বিয়ে দিয়েছলেন।

আমার তখন সবে নতুন বিয়ে হয়েছে,  আষাঢ় মাসের কোন একদিন তুমুল বর্ষা পরেছে। দিঘী,পুকুর,পুষ্কুনি ডুবে গেছে। পূর্ণিমা রোড টা তখন কাঁচা ছিল বন্যার জলে ভেসে গেছে।
এমন একদিনে যখন শশুড় বাড়ি যাওয়ার রাস্তাও বন্ধ। আমাদের মানে আমাকে আর আমার বউ সেতাকে একটা গল্প শুনিয়েছিল। রানী পদ্মাবতীর চন্দ্রহারের গল্প!

'আমার শশুর তখন সবে রায়বাহাদুর খেতাপ পেয়েছেন, সাথে জমিদারি। কি ছিল না আমাদের? আস্তাবলে চার চারটে ঘোড়া, ঘোড়ার গাড়ি, গোয়াল ভরা গরু, হাজার বিঘের জমিদারী। তোর ঠাকুরদাদা কলকাতায় থেকে কলেজের পড়াশোনা শেষ করলে। আমাকে তোর ঠাকুরদাদার জন্য এগারো কুঁড়ি এক টাকা পণ দিয়ে ঘরের বউ করে আনলো। দেবেন্দ্র টা তখনো ছোট (দেবেন্দ্র নারায়ণ রায় ছিলেন আমার আমার ঠাকুরদাদার একমাত্র ছোটভাই) ওকেও কলকাতা পাঠানো হলো লেখাপড়ার জন্য।
তোর ঠাকুরদাদা এখানেই থেকে গেল বাবার জমিদারী দেখাশোনা করার জন্য।
এদিকে ইংরেজ দের নিমিন্ত্রন রক্ষা আর জমিদারীর কাজে আমার শশুড়মশাই প্রায়শই কলকাতা যেতেন। ছোট ছেলের জন্য নিয়ে যেতেন বাগানের ফল, আমার হাতের তৈরি আচার আর শুকনো খাবার।
আসার সময় কখনো নিয়ে আসতেন তোর ঠাকুরদাদার জন্য বিলেতি স্যুট, কোট, আমার জন্য কাস্মীরি শাল, শাড়ি।

এমনি একবার কলকাতা গেলেন জমিদারী কাজে, আমার শাশুড়ি অনেক আগেই মা হতে গিয়ে মারা গিয়েছিলেন তারপর শশুড়  আর বিয়ে করেননি। আর আমার শশুরের কোন মেয় ছিল না। তার জন্যই বোধহয়, আমাকে খুব ভালবাসতেন। সে বার আমার জন্য নিয়ে আসলেন বাইশ ভরী ওজনের সোনার চন্দ্র হার। আমার হাতে দিয়ে বললেন পরে দেখাও তো মা কেমন লাগতেছে আমার মা কে রানী পদ্মাবতীর চন্দ্রহার পরে।

যেদিন বাড়িতে চন্দ্রহার ডুকলো সেদিনি সুস্থ সবল ঘোড়া দুটো মুখ থুবড়ে পরে মারা গেলো।
গাঁয়ের কারো গোঁয়ালে খূড়াই ধরলো না কারো গরু মরলো না কিন্তু আমাদের গোঁয়ালের অর্ধেক গরু খূঁড়াই রোগে মরে গেল একমাসে।
গ্রীষ্মে দেবা বাড়িতে আসলো ঘুরতে, এক বিকেলে বন্ধুদের সাথে নদীপারে ঘুরতে গিয়ে বাড়ি ফেরার সময় চরকপরে আম বাগানে মরে পরে রইলো। আমার দেবা রে, দেবা। আমার সোনা চান.........

আমাদের জমিদারী চলে গেল তার পরের বছর।

সুখের সংসার উচ্ছন্নে গেল, তোর বাবা আর তোর পিসি এল আমার কোল জুড়ে একসাথে।
তার কিছুদিন পর তোর ঠাকুর দা অসুখে পরলো, মরন অসুখ।
কোন ঔষধেই কাজ হয় না। দিন কে দিন লোক টা নিস্তেজ হতে থাকলো। জ্বর আর ছাড়লো না।
আমার শশুড় ভোরের আগেই বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় ফিরে দুই তিন পর মাঝ রাতে।
কোথায় যায়নি? সৈয়দপুর, রংপুর, ঢাকা, চট্টগ্রাম, কলকাতা যে যেখানেই বলেছে ওখানকার কবিরাজ ভাল ওর ঔষধ খেয়ে অমুক ভাল হল, সেখানেই গেছে।

দিন কে দিন আমার শশুড় মশাইও ভেঙে পরলো, সব আশা মিশে গেছে তাঁর। কোথাও যান না, কিছু বলেন না। দুই হাঁটুর মাঝে মাথা দিয়ে কাঁঠাল কাঠের পিঁড়িতে বসে থাকেন।
বাচ্চারা এমনকি বড় মানুষ গুলোও আমার শশুড় কে বলতে শুরু করলো তিন মাথিয়া বুড়া। দুই হাঁটুর মাঝে মাথা সহ তিন মাথাই মনে হত দূর হতে দেখলে।

অবশেষে একদিন উত্তর হতে এক তান্ত্রিক ফকির এলো,  বলল মা এক ঘটি জল দাও বড্ড তেষ্টা পেয়েছে।
তোর ঠাকুরদাদা তখন আঙ্গিনায় খাঁটে সুয়ে ছিল, তার পাশে আমার শশুড় কাঁঠের পিঁড়িতে বসে। তাঁকে দেখে বলল " তোমার ছেলে বাঁচবে না, তাকে লন্ডন নিয়ে গেলেও  বাঁচবে না। যে চলে যাবে তাকে যেতে দাও যারা আছে তাদের আগলে ধরো। তাদের রক্ষা করো।"

কি বলতে চাও তুমি? শশুড় বাবা মাথা তুলে হুংকার ছাড়লেন।

ফকির একটুও বিচলিত না হয়ে বলল, " তুই পাপি কলকাতা হতে রানী পদ্মাবতীর অভিশপ্ত চন্দ্রহার কিনেছিস, তার জন্য তো এই দোষা যদি বাঁচতে চাস বংসের প্রদীপ রক্ষা করতে চাস আরেকটা চন্দ্রহার বানিয়ে এক হাজার একটি স্বর্ণমুদ্রাসহ কলসে ভরে সপ্তমুনী বন দিয়ে পুর্ণিমা রাতে ঈশাণ কোনে মাটিতে পুতে দিস।

অবশেষে নিরুপায় হয়ে আমার শশুড় তাই করলো। জমি বিক্রি করে, জমানো টাকা,অলংকার ভাঙ্গিয়ে কলকাতার সেকরার দের দিয়ে  আরেকটি চন্দ্রহার বানিয়ে, এক হাজার একটি স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে আসলো।
সেই তান্ত্রিক কে খুঁজে বের করে তার মতে সব করা হলো।
তিন দিনের রাতে তোর ঠাকুর দা মারা গেল।

শোক সইতে না পেরে আমার শশুড় সে বছরেই মারা গেলেন।"

রানী পদ্মাবতীর চন্দ্রহার

২য় অংশ

এভাবেই আমার ঠাকুমার গল্প অর্থাৎ আমাদের পরিবারের ইতিহাস বলা শেষ হয়।
গল্প শেষে আমার ঠাকুমা আমাকে বার বার নিষেদ করেছিলেন, আমি যেন সেই চন্দ্রহার দুটো খুঁড়ে বের না করি।


সময়ের ফেরে সেই জমজ চন্দ্রহার, স্বর্ণ মুদ্রার কথা ভুলে যাই।

সেতার কোলে আমার এক ছেলে, এক মেয়ের জন্ম হয়।
ততোদিনে আমার ঠাকুমা গত হয়েছেন।
আমাকে শাসন,দেখে রাখার মত কেউ ছিল না আর। বাবা,মা আগেই গত হয়েছিলেন।

নেশা, জুয়া, নারী মোহে ডুবে যাই।
সেতাকে ধোঁকা দিয়ে দ্বিতীয় বউ ঘরে তুলি।
বলতে গেলে বলা যায়,বাধ্য হয়েই দ্বিতীয় বিয়ে করি।
সে আমার আরেক পাপের ইতিহাস।

দ্বিতীয় বউ ঘরে তোলার পর সেতা দুইবার আত্মহত্যার চেস্টা করে।

এরপর দ্বিতীয় বউকে ছেড়ে দেই।
দ্বিতীয় বউকে ছাড়তে আর সংসার টেকাতে কেস মামলায় জড়িয়ে যাই।

কেস চালাতে গিয়ে আর আমার বেপরোয়া জীবন যাপনে বাপ দাদার দিয়ে যাওয়া সম্পদের মাঝে শুধু তিন একর জমির উপর আমাদের বাড়িটি টিকে থাকে।

ভাদ্রমাসের কোন একদিন, তালপাকা গরম পরেছে। বৈঠক ঘরে বসে আছি। এই সেই বৈঠক ঘর, একসময় যে ঘরে আমার প্রপিতামহ কৈলাশনারায়ন রায়বাহাদুর জমিদারি চালাতেন, কলকাতা থেকে আসা নর্তককীদের মুজরা বসত।
কলকাতা থেকে আসা উকিল, ব্যবসায়ী লোকদের আপ্যায়ন করা হত এই ঘরে বসেই।

আমি এই ঘরে মাঝে মাঝে এসে সময় কাটাই, বাড়ির একমাত্র টিকে যাওয়া কাজের লোক অনিলের সাথে গল্প করি, হুকুতে তামুক খাই।
কারন যাওয়ার মত কোন যায়গা নেই।
অথবা যাওয়ার সামর্থ্য নেই!

বসে বসে হুকুতে তামাক খাচ্ছি। এমন সময় অনিল আসলো।
"হুজুর পন্ডিত মশাই এসেছেন"
নামে পন্ডিত! কাজেও পন্ডিত!
আমার পরামর্শ ও ধারের অর্থ যোগান দাতা।
আমার বাপ দাদার অর্ধেকের বেশি সম্পতি বাঁধা পড়েছে অথবা দলিল হয়েছে এই পন্ডিতের নামে।
পন্ডিত নাম টা দেওয়া আমারি আদতে একজন ব্যবসায়ী।
জানি আজকে আসবেন ধারের টাকার সুদের জন্য।

ঘরে প্রবেশ করে প্রণাম করে মুস্কি হাঁসি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন "কেমন আছেন রায়বাহাদুর সাহেব? আপনাকে আজকাল বাইরে দেখাই যায় না। তাই এদিক দিয়ে যেতে যেতে মনে হলো দেখা করেই যাই"

নিছক বিনয় প্রকাশ না খেয়াল করলেও বিনয়ের নগ্নভাব টা বুঝা যায়, বিরক্তিকর।
এই কে আছিস পন্ডিত মশাইকে কে জলখাবার দিয়ে যা বলে কথা পারলাম।
আপনি যে জন্য এসেছেন তা আজ হবে না।
আপনাকে অন্য আরেকদিন কষ্ট করে আসতে হবে নতুবা আমিই বের হবো কোনদিন।

না না তা লাগবে না, আমিই আসবো, আপনার এই অসুস্থ শরীর নিয়ে বের হবার প্রয়োজন নেই। আজ তাহলে আমি উঠি।

ব্যবসায়ীর চোখ! আমাকে আরাম কেদারায় আধশোয়া দেখে ধরে নিয়েছেন আমি অসুস্থ! অথবা জেনেবুঝেই চাল টা চাললেন। আমি কবে গিয়ে তার সাথে দেখা করবো না করবো তার চেয়ে নিজে আসার সুযোগ টা হাত ছাড়া করলেন না।

চা, তামুক ফেলেই পন্ডিত দৌড় দিলেন!

আমার ঠাকুমা বলে গিয়েছিলেন, "যত দিন যায়, যায় ভাল আসে খারাপ"

আমারো তাই হলো। সংসারের অভাব বাড়তেই থাকলো আমার বাইরে যাওয়া বন্ধ করেছি হাউস রং সব বন্ধ তবুও অভাব বাড়তেই থাকলো।

এদিকে বাড়ির সাথে আম বাগানখানি পন্ডিতের কাছে বন্ধ, কাল টাকা না দিতে পারলে পরশু দলিল করে দিতে হবে।

এমন এক সন্ধায় বাড়ির আম বাগানে হাটতেছি, হঠাৎ মনে হল কে যেন সামনে দাঁড়িয়ে ঠাকুমা? না কেউ নেই।

এর কিছুদিন পর রাতে ঠাকুমাকে স্বপ্নে দেখলাম আমাকে আর সেতা কে রানী পদ্মাবতীর চন্দ্রহারের গল্প শুনাচ্ছেন!

আসলে কি তা স্বপ্ন ছিল? না আমার অবচেতন মনের ভাবনায় যা চলতেছিলো তাই'ই?

এর মাঝে পন্ডিত দুবার এসে ঘুরে গেছে। একবার দেখা করে বলেছি একটু দেরি হবে।
আরেক বার অনিল কে দিয়ে বলিয়েছি আমি অসুস্থ! দেখা করতে পারবো না।
যদিও আমি কথা বলতে অসমর্থ এমন অসুস্থ হয়নি কখনো।

আমার ছেলে অমলেন্দু কে পড়াশোনার জন্য কলকাতায় পাঠিয়েছি একবছর হলো, মেয় কল্পনার এবার ১৩ তে পড়লো।
মেয়ের বিয়ের খরচের ভাবনা, ছেলের কলকাতার পড়াশোনার খরচ আমাকে জর্জরিত করে ফেলে।

সব দিক থেকে অভাব আর অভাব।
শেষে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত টি নিয়েই ফেলি। যদিও সব কিছুই, ভয়,অভিশাপ জানতাম।

এর কিছুদিন পর ঠিকই আম বাগানের বুজে যাওয়া কুয়ো খুড়ে বুড়ো অনিল আর আমি জোড়া চন্দ্রহার খুঁজে বের করি।

ঠাকুমার সতর্কবাণী কিংবা রানী পদ্মাবতীর অভিশাপের ভয়েই হউক আমি চন্দ্রহার গুলোতে হাত দেই নি। ওগুলো সিন্দুকে তুলে রাখার পর স্বর্ণ মুদ্রাগুলো গলিয়ে দেদারচ্ছে খরচ করি। অনেক দিন পর ফিরে আসে সেই পুরনো রাত!

এরপর তিন মাসে তেমন কিছু ঘটেনি।
বছর শেষ হবার আগেই ভাল ঘর দেখে মেয়ের বিয়ে দেই ছেলে ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট।

এরপরেই ঘটতে শুরু করে অঘটন গুলো।
আমি প্রায় প্রতিরাতেই স্বপ্নে, না বরং বলা চলে দুঃস্বপ্নে রানী পদ্মাবতী কে দেখতে পাই!
তার আত্মবিলাপ, জমিদারী, রুপ, করুন পরিণতি। একসময় আমি কোন টা স্বপ্ন কোন টা বাস্তব তা ভুলে যাই।

রানী পদ্মাবতী কে নিয়ে দেখা স্বপ্ন গুলো নিয়ে বলবো অন্য কোথাও।

এরপর যা ঘটেছিল আমার জীবনে তা বলি।
আমার জামাতা হঠ্যাৎ করে বিনা অসুখে মারা যায়, আমার একমাত্র কন্যা কল্পনা বিধবা হয়ে যায়।

এ শোক সইতে না পেরে আমার সহধর্মিণী, আমার প্রাণপ্রিয়া সেতা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।
এক ভোরে তার ঝুলন্ত লাশ অনিল আম বাগানে দেখতে পায়।

এর তিন মাস পর আমার একমাত্র ছেলে, আমার বংসের একমাত্র বংসপ্রদীপ অমলেন্দু কলকাতায় ট্রাম দুর্ঘটনায় মারা যায়!

কি আর বেঁচে থাকলো আমার জীবনে?
অভাব ছিল তবুও তো আমার সব ছিল!
এত অল্প সময়ে এত সব দুর্ঘটনা কি নিছকই কাকাতালীয়?

গল্পিকা

জানো গত বর্ষার আগেরবার, সেবার তেমন বর্ষা পরে নি। তবুও খাল, পুর্ণিমা রোডের নয়ঞ্জলি গুলো বৃষ্টির জলে ভরে গিয়েছিলো।
আর সেগুলো সাদা সাদা শাপলায় ভরে গিয়েছিলো, কদম গাছে কদম ফুটেছিলো কেন জানি অন্য আগের বারের চেয়ে অনেক বেশি। তোমাকে বলতেই তুমি জিদ ধরে বসলে তোমার জন্য শাপলা, কদম না নিয়ে, যেন দিনাজপুরে না আসি!
তোমার জন্য শাপলা কদম নিয়ে যেতে যেতে আরেক মজার ঘটনা! তোমাকে তো বলেছিলাম তাই না?
যাই হউক এবার যেটা বলার জন্য এত ভূমিকার অবতারনা! আমি লিলিমোড়ে বাস থেকে নামলাম তুমি বরাবরের মতই লেট!
আধা ঘন্টা দেরিতে এসে রিক্সা থেকে নেমে বললে হাদারাম! সত্যি সত্যি শাপলা নিয়ে এসেছে! আমি তো মজা করেছিলাম!
শাপলা গুলো হাতে নিয়ে কদম গুলো ভ্যানিটিব্যাগে রাখতে রাখতে বললে, কোথায় যাবে, কি জন্য এসেছো বলো।
আমি ভয়ে ভয়ে বলেছিলাম, একটা বই আর একটা জুতো কিনবো!
গাঁধা একটা জুতো দিয়ে কি করবা? পায়ে পরবা না গলায় ঝুলাবা?
এরপর জেলখানা মোড়ের দোকান গুলো থেকে তুমি পছন্দ করে জুতো কিনে দিলে।
না, একটা না এক জোড়াই!
হ্যাঁ আমি সেই জুতো জোড়াটার কথায় বলতেছি! জানো গতকাল সেই সেন্ডেল জোড়ার বাঁ পায়েরটার বাম পাশের ফিতে টা ছিঁড়ে গেছে।

আই লাভ ইউ কুত্তা

আরেকবার বলে দেখ
আই লাভ ইউ।
এবার বল হাত পা ভেঙে যদি নাই দেই শয়তান
আই লাভ ইউ।
হারামি মর তুই
আই লাভ ইউ
কুত্তা
আই লাভ ইউ
চুপ কর শয়তান
আই লাভ ইউ
পিটিয়ে ল্যাংড়া করে দিবো জানোয়ার
আই লাভ ইউ
এই ছিলো তোর মনে হারামি, কুত্তা, জানোয়ার কোথাকার।
আই লাভ ইউ
.
.
.
আর গালি দিবে না?
ঠোঁট বন্ধ গালি দিবো কিভাবে?
কুত্তি আই লাভ ইউ ইউ
কুত্তা
September 21 at 11:58pm

আর কোন পথ নেই..

আর কোন পথ নেই, দেয়ালে পীঠ ঠেকে গেছে জানেন। কোন উপায় নেই আর।
যা করার আজকেই করতে হবে।
আসলে আমরা এরোকম টা চাইনি জানেন।
আমাদেরো একটা স্বপ্ন ছিলো।
বিশেষ করে ওর, কনের সাঁজে ওকে কেমন লাগবে ওর দেখার খুব শখ।
গত পয়েলা বৈশাখে যেদিন ও প্রথম শাড়ি পড়লো সেদিন ও কি খুশি!
সেদিন পইপই করে বলে রেখেছিলো আমি যেন পাঞ্জাবী পরে আসি।
আমি ওর সাথে মস্কারা করে বলেছিলাম ধুতি পরে আসি?
মর্ডান মোরের দোকান গুলো থেকে টোপড় টাও কিনে নেওয়া যাবে তারপর কালিমন্দিরে গিয়ে..
সে শুধু বলেছিল "নাহ"
এভাবে বিয়ে করতে পারবো না।
বাবা, মার আশীর্বাদ না নিয়ে বিয়ে করলে অমঙ্গল হয়। সংসার টিকে না।
সেদিন ও হলুদ রঙের শাড়ি পরে মাথায় ফুলের মুকুট দিয়েছিল।
আমি বললাম এ কি সেঁজেছো এ তো পয়েলা ফাল্গুনের সাঁজ!
সে লাজুক হেসে বলে মুখ লুকিয়েছিলো "তুমি বুঝো না,আজ তো আমার গাঁয়ে হলুদ"
বিয়ের কথা উঠলেই ও কল্পনায় ডুবে যেত, মহা ধুমধাম করে আমাদের বিয়ে হবে। কোন কমিনিউটি সেন্টারে না বিয়ে বাড়িতে হতে হবে।
কমিনিউটি সেন্টারে বিয়ে ভাল না সবাই আসে না,যায়গা অল্প।
আরো বলতো বিয়ে বাড়ির গেট টা হতে হবে পাহাড়পুরের রতন বেকারিদের দুর্গাপূজোর গেট টির মত বড়।
বিয়ের মন্ডপ টা হতে হবে সেরোকম যেন অর্চিতার বিয়ের মন্ডপটার চেয়েও সুন্দর হয়।
আমি জিজ্ঞেস করি আর বাসর ঘর?
যাও লজ্জা করে না বুঝি বলে মুখ লুকাতো।
আজ আর এসব ভেবে লাভ নেই।
সব সময় কল্পনায় বিভোর, হাসি খুশি পুতুল টা আমার কেমন জানি হয়ে গেছে।
গত কয়েক দিন থেকে হাসিখুশি ভাব টা মরে গেছে, দশমির দিনে দেবী ভাসানের সময় মা, মাসিদের মুখ টা যেমন মলিন হয়ে যায় ঠিক তেমন, হাসে না কথা বলে না।
ওর এই রুপ টা আমি কখনো দেখি নি রিক্সা থেকে নামার সময় বলল হয় কালকেই নয়তো কোন দিনেই নয়।
আসলে কি জানেন ওরা আমারদের স্বপ্ন গুলো মেরে ফেলার জন্য কোন ত্রুটি রাখে নি।
জানি আজকের পর আগামীকাল আমার বাবা, দাদাদের নামে থানায় কেস দায়ের হবে আমাকে এক নাম্বার আসামি করে।
রাতুলের নাম টাও দিবে বোধহয় ওর সাথেই তো সকাল সন্ধা উঠবস আমার ওরা ভাল করেই জানে।
খুব খারাপ লাগতেছে জানেন আমার জন্য, শুধু আমার জন্যই আমার বৃদ্ধ বাবাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে, দুই একটা লোকাল পেপারে নিউজ আসবে নাবালিকা অপহরণের।
বিনা অপরাধে রাতুল টাকেও অপহরণকারী হতে হবে।
দাদাদের সামনে তো কখনোই দাঁড়াতে পারবো না ওরা আমাকে পেলে জানে মেরেই ফেলবে বোধহয়!
কিন্তু কিছু করার নাই জানেন যা করার আজকে রাতেই করতে হবে।
ও বলে দিয়েছে হয় আজকে নয়তো কোন দিনেই নয়।
ঠিক একটায় লগ্ন এগারটায় বর আসবে যা করার এগার টা থেকে ১ টার ভিতরেই করতে হবে।
জানেন আমাদের আর কোন উপায় নেই।
দেয়ালে পীঠ ঠেকে গেছে।

রাজনীতি ও প্রেমিক

সত্যি বলতে কি আমি তো প্রেমিক মানুষ! রাজনীতির কয়টা 'র' এর মানেই বা জানি?
আন্দোলন, অভ্যুত্থান বলতে সে তো বুঝি তোমায় নিয়ে বুকের ভিতর উথালপাতাল তোলপাড়।
যদিও অনেকেই বলতো আমার রাজনীতি জানার উচিত ছিলো!
বিছানার খেলায় সে তো আর খেলা নয়! সে নাকি রাজনীতির ময়দান!
হার জিত হয় প্রতিরাতে!
শেয়ানে শেয়ানে লড়াই বড়দের গল্প শুনেছিলাম আড়ালে আবডালে।
আমি কি অতশত বুঝি বল?
আমি তো তোমার চুলের বাঁধনে আষ্ঠেপৃষ্টে জড়িয়ে গেছি সে কবেই, পথ হারিয়ে খুঁজি তোমার গভীর চোখে কতকাল!
তবুও তারা বলতো আমি বুঝি নাই কখনো আমার "রাজনীতি শেখার উচিত ছিলো।"
তুমি যেদিন বললে চল পালিয়ে যাই সেদিনেও হয়তোবা তারা বলতে চেয়েছিলো ছেলেটির রাজনীতি জানা উচিত ছিলো ।
তারপর যেদিন দুজনে ধরা পরলাম সেদিন থানার কনেস্টেবল টি বলেছিলো "বেডার রাজনৈতিক জ্ঞানের বড়ই অভাবে, সরকারি পার্টির থানা সেক্রেটারির মেয় কে নিয়ে ভেগেছে"
লোকে এখন বলে আমি এখান থেকেই শুনতে পাই উরো খবরে "মেয়টা খুবই বুদ্ধিমতী কেমন করে নিজেকে সামলে নিয়েছে দেখেছেন?"
সামনের মাসে ফ্লাইড...
image



image

তাহারা এবং তাদের ঈশ্বর!

ঈশ্বরের পা দুখানি ছেড়ে যখন
প্রথমবার যুক্তির পাতা গুলো
উল্টাচ্ছিলাম তখন শেষবার তার
চোখ রাঙানি দেখেছিলাম।
সেই শেষবার।
যখন যুক্তির পাঠ শেষ করলাম তখন সে
ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছিলো।
যখন প্রথম বার যুক্তির কথা তুলি তখন
সে উঠে চলে যায়।
কখনো দেখিনি তাকে আর।
এরপর যখন আমি যুক্তির কথা বলতে
মঞ্চে উঠি কেউ বা কারা এসে
পিছনে দাঁড়ালো বুঝি।
প্রথম বাক্য টা বলার পর কেউ কেউ
অতি উৎসাহী না বুঝেই হাত তালি
দিলো।
দ্বিতীয় বাক্য টার পর মৃদু গুঞ্জন
শোনা গেলো কি?
আমার তৃতীয় বাক্যটি শোনার পর
এবার কি গন্ডগোল বেঁধে যাবে?
তবুও কিছু মনোযোগী শ্রোতা
পাওয়া গেলো!
চতুর্থ বাক্য
(এরি মাঝে খবর আসলো যুক্তি নিয়ে
তাদের সাথে কথা বলতে গিয়ে
আহত হয়েছে আমারি মত কয়েক জন)
পঞ্চম বাক্য শেষ হবার আগেই খবর
পৌঁচাল কয়েক জন.... নেই
ভাবলাম নেমে যাওয়ার আগে
ধন্যবাদ দিয়ে যাই এতক্ষণ ধৈর্য
সহকারে আমার কথা শোনার জন্য।
পিছনের ছায়া মুর্তি গুলো কি নড়ে
উঠলো একটু?
আমার নাকটি যখন মাটিতে ঘষা
খেল তখন বিদ্রূপাত্মক হাসি ছাড়া
কিছুই শুনিনি।
কেউ বলল না লোকটা ঐ যুক্তিতে ভুল
ছিলো।
৫/৮/২০১৫

ভুলতেছি আমি ভুলের রাজ্যে। তুমি এবং তোমাকে! ভুলে যাচ্ছি চিহ্ন, ভুলে যাচ্ছি চেহেরা। ভুলছি, কি ভুল করছি তাতে! ভুল হচ্ছে দিন রাত, ভুল করতেছ...