এসো প্রেয়সী বিবাদে জোড়াই।
আমি প্রতিবন্ধী, তুমি অভিমানী হও, অভিমান কর বৃথাই।
কী স্বাভাবিক ভাবেই না, গেল দিনটা!
আর পাঁচ টা দিনের মতোই খাওয়া ঘুম আড্ডায়!
বন্ধু জিজ্ঞেস করে কেমন আছিস? ধুর বালের লাইফ, জঘন্য।
ঠিক এই দিন টাকেই মিস করবো নিশ্চিত অন্য কোন দিন অন্য কোন সময়!
মানুষ কেন মরতে চায়?
স্যার অগাস্টকোৎ আমি আপনার আত্মহত্যার তিন টি কারন মানি না, একদম না।
April 19 at 11:04pm
সবাই পালাতে চায়, সবাই হারাতে চায়।
শুধু এই ভয়ে পালায় না, হারিয়ে যায় না।
পাছে পিছে কেউ না ডাকে, কেউ না খুঁজে!
April 21 at 5:33am
এখনো অনেক কিছু হারাবার আছে,
এখনি নিঃস্ব ভাবো কেনো মন।

ভাল মানুষ

ভাল মানুষ তো শুধু ভাল নয় বহু ধরনের হয়।
ভাল মানুষ বোকা হয়
ভাল মানুষ বাচাল হয়
ভাল মানুষের ইগো হয়
ভাল মানুষ পাগল হয়
কিছু ভাল মানুষ ছাগল হয়
কিছু ভাল মানুষ মূর্খ হয়
সব ভাল মানুষ আদতেই ভাল নয়।
সাবধান করার পরেও আগুনে হাত দিয়েছি বলেই তো পুড়েছে। এখন ভেবেই কি বা লাভ??
নীতি কথা আমি শুনি না।
একবার পুড়েছি যখন আজীবন পুড়বো। ভেবেছো কি তিস্তার পানি? এক বাধেঁই শুকিয়ে যাবে?
তোমার বুকে এখনো কি পদ্মা মেঘনা বহে?
মানুষ কেন মরে যায় সামান্য পেট ব্যাথায়?
কি অবাক করা ব্যাপার তাই না?
তারো আরেকটু উপরে কি কঠিন ব্যাথা নিয়ে অবলীলায় বেঁচে আছি আজ সহস্র বছর!

মৃত্যু

আজ আর কোন গল্প নেই।
মরন দেখে এলাম খাটের উপর বাঁশের তালায় ঝুলে আছে।
জানো এখন ভাল থাকতে আমার একদম কষ্ট হয় না।
খুব সহজ ভাবেই ভাল থাকি।
দূর আকাশের কালো মেঘ গুলোর মত ভেসে ভেসে,
খাঁচায় বন্দি পাখিটির মত আপন সুখে গান গাই।
খুব সহজেই ভাল থাকি এখন তোমাকে ছাড়াই!
ভালবাসা তো আর পানি নয় আন্তর্জাতিক আইনও নেই।
তাই উজানের প্রভাবশালী রাষ্ট্রের সরকার,
বাঁধ দিয়ে যায়।
ভালবাসা প্রত্যাহার করে নেয় বারবার।

লাশ

দুহাতে একটা লাশ নিয়ে বসে আছি
নবীন কবির আধুনিকতার নামে অত্যাচারে অপমৃত্যু হয়েছে তার।

বালিকা এবং কুকুর

অসংখ্য মাংস লোভী কুকুরের দল দেখে আসলাম বালিকার সারা উঠোন জুড়ে।
কেউ কেউ লেজ নাড়িয়ে বালিকার মনোযোগ পেতে সদা ব্যস্ত।
সারা উঠোন জুড়ে গড়াগড়ি দিতেও দেখলাম কয়েকটাকে।
দূরে বসে আয়েশি ঢঙে লালা ঝড়াচ্ছে বুড়ো কুকুরের দল।
উঠোনের পিছনে খিড়কী দরজায় আরেক দলের আনাগোনা।
কে নেই তাতে? সদ্য বয়ঃপ্রাপ্ত অতি উৎসুক নবীন কুকুরের দল থেকে দলের সবচেয়ে গুরুগম্ভীর বৃদ্ধ কুকুরটিও।
বালিকার মন যোগাতে অতি ব্যস্ত।

নামহীন (উপন্যাস)

ততোদিনে সব কিছু সয়ে গেছে এই পোড়া শরীরে।
নতুন কিছু নেই রাতে বাবুরা আসে ঘাম ঝড়িয়ে যায়, ম্যানিব্যাগ হতে চকচকে নতুন একশ, পাঁচশ টাকার নোট, ময়লা,শতভাজ পরা টাকা সব চলে, যা আসে তাতেই মাসী খুশি হয়।
তেমন কঠিন কিছু লাগে না আর মনের দরজা বন্ধ করে চিত হয়ে শুয়ে থাকলেই হলো।
কাজলি আপা বলে যায়, মাগি বেশি নকরামি করবি তো বুঝবি। তার চেয়ে সব মাইনা নে।
এটাই আমাগো জীবন রে বইন।
মনের ঘরে তালা বাইন্ধা শুইয়া থাকবি, চার পাঁচ মিনিটেরি তো ব্যাপার।  সব বেটাগোর দম দেহা আছে। দুই মিনিটেই মাল আউট।
ঘামের গন্ধ আইলে দম বন্ধ করে শুইয়া থাকবি।

এই নোংরা, নষ্ট জীবনেও মাঝে মাঝে কৌতুহল আসে, কাজলি আপা কে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে "তুমি তো আমাদের মত করে কথা বলতে পারো তাহলে এরোকম করে কথা বলো কেনো? তুমি তো মুক্ত, আমার মত কোন মাসী নামের ডাইনি তোমাকে আটকে রাখেনি তুমি এই নরক থেকে চলে যাও না কেন?"

আমাকে চুপ থাকতে দেখে কাজলি আপা বলে উঠে, ঐ মাগি, চুপ করে আছো কেন? কি বুঝলা? এইহানের নিয়ম কানুন যত তারাতারি মাইনা নিতে পারবা, শিখতে পারবা ততো ভাল থাকবা বুইজ্জো?

যাইগা, নিজেরে সাইজা গুইজা লও। বাবুসাব গনের আহনের টাইম অইতাছে।

কোথায় ছিলাম আমি, আর এখন কোথায়!
দিনাজপুর! সুখের নীর, বাবা, মা, বোন কে ছেড়ে তাদের কাঁদিয়ে কত স্বপ্নে বিভোর হয়ে বের হয়ে ছিলাম আমি!

ঐ ছেমড়ি সাইজা লও আট টা বাজে বাবুদের আহনের টাইম হইছে।

বিকেল সারে পাঁচটার বাসে উঠেছিলাম আমরা, হানিফ পরিবহন। কালিতলার থানার পাশের কাউন্টারে। ঢাকা টু চট্টগ্রাম।
স্পষ্ট মনে আছে কাউন্টারের পাশের দোকান থেকে সে আমার জন্য হাফ লিটারের প্রাণ কোম্পানির আমের জুস কিনে এনেছিলো।

বলেছিলো, বেবি তুমি একদম দুশ্চিন্তা করো না, আই উইল ম্যানেজ। এভেরিথিং উইল বি ফাইন। আমরা প্রথমে কক্সেসবাজার যাবো, সেন্টমার্টিন যাবো কয়েকদিন সেখানে হানিমুন করে ঢাকায় ব্যাক করবো। আমি জবে জয়েন করবো। আর এই কয়দিনের ভিতরে আমার ফ্রেন্ড আমাদের জন্য বাসা ম্যানেজ করে ফেলবে।

আমার তার উপর বিশ্বাস ছিল।
তৃতীয়বার যখন দুর্ঘটনা টি ঘটলো আমি চাইনি একদম চাইনি আমার খুব কষ্ট হচ্ছিলো।
আমি তাকে বিশ্বাস করতাম।
সে বলেছিলো, বেবি লেট মি হ্যান্ডেল দিজ, তুমি এইবারের মত আমার কথা শুনো এটা ফেলে দাও। আমি কথা দিচ্ছি আই উইল টেক ইউ এ্যা লং এওয়ে।

সে কথা রেখেছে, আজ আমরা যাচ্ছি। আমাদের সুখের সংসার হবে। কেউ থাকবে না বাঁধা দেওয়ার। না সমাজ না ধর্ম।

কত স্বপ্ন ছিল তখন দুচোখে।

(.....চলবে)

কুকুর

ঠিক সেই প্রভুহীন কুকুর টির মতই যাকে আর দশজনে নিতে চায়, আদর ভালবাসায় পালতে চায়।
কিন্তু সে কারো হতে চায় না, কি কারন?
বহুদিন আগে যার সে হতে চেয়েছিলো, তারিয়ে দিয়েছে, চেয়েছিল একটু আশ্রয়। তার বন্ধ দরজায় বার বার ঘুরে যায়।
তার দরজা খোলা আছে কি?
খুলেছে কি? না আজো খুলেনি।
না আজো ডাকেনি।
ডাকতেও তো পারে 'এসো' একবার!

হঠ্যাৎ করে ভালবাসি বলে চমকে দে না আমায়

হটাৎ করে ভালবাসি বলে চমকে
দে না আমায়।
আজ বিনা মেঘে বজ্রপাত হউক।
শিলাবৃষ্টির মত গোটা গোটা
ভালবাসা ঝড়ে পড়ুক।
June 15, 2014 at 8:18pm

তুমি নেই

তোমার নিরুদ্দেশ হবার পর হাতে অনেক অখন্ড সময়।
তোমাকেই নিয়ে ভাবি শুধু বললে ভুল হবে সময় মত খাই, ঘুমাই,গোসুল করি আর স্বাভাবিক ভাবে সব কিছুই করি আগের মত!
কি আজব! তাই না?
ভাবি সারাটাদিন রাত, রাতে ঘুম হয় না জানো? এটাকেই কি ভালবাসা বলে? তোমার প্রতি আমার ভালবাসা? এটুকুই?
নদীর পার ভেঙে হৃদয়ের মাঝখানে যে বিশাল গাঙ্গের শুণ্যতা তৈরি হয়েছে তার গভীরতা বুঝতে পারি জানো।
তার পরেও প্রশ্ন ঊঁকি দেয় এটুকুই ভালবাসা?  মাত্র এটুকুই?
এটাকেই ভালবাসা বলে?
তুমি নেই! এটুকুতেই সব হয়ে গেলো?
তুমি নেই! কেউ বুঝতে পারতেছে না জানো,কেউ না!
তুমি না থাকাটা যে কি
কেউ বুঝতে পারতেছে না!
চোখ দুটোকে জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয় আমার ঘুম নেই ব্যাস! আর কিছু না!
বুকের মাঝে যার টের পাই তাকে বলি সে উত্তর দেয় আমায় শূন্যতা ভর করেছে! ব্যাস!
দেখেছো সবাই নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত! ভালবাসা কই?
তুমি নেই কেউ বুঝতে পারতেছে না!
তুমি নেই! ভাবা যায়?
খুব বড় গলায় বলে ছিলো যে ৫৫'র পরে রবো তোমার অপেক্ষায় সেও আজ কিছু বলে না!
আসলেই কি জানো এখন ভাবি সব কিছুর বোধহয়  প্রয়োজনে ছিলো!
তুমি নেই কেউ বুঝতে পারতেছে না।
তুমি নেই!

গল্পিকা ১

আর কোন রাস্তা নেই, পীঠ ঠেকে গেছে জানেন। কোন উপায় নেই আর।
যা করার আজকেই করতে হবে।
আসলে আমরা এরোকম টা চাইনি জানেন।
আমাদেরো একটা স্বপ্ন ছিল দেয়ালে ো।
বিশেষ করে ওর, কনের সাঁজে ওকে কেমন লাগবে ওর জানার খুব ইচ্ছে।
গত পয়েলা বৈশাখে যেদিন ও প্রথম শাড়ি পড়লো সেদিন ও কি খুশি!
সেদিন পইপই করে বলে রেখেছিলো আমি যেন পাঞ্জাবী পরে আসি।
আমি ওর সাথে মস্কারা করে বলেছিলাম ধুতি পরে আসি?
মর্ডান মোরের দোকান গুলো থেকে টোপড় টাও কিনে নেওয়া যাবে তারপর কালিমন্দিরে গিয়ে..

সে শুধু বলেছিল "নাহ"
এভাবে বিয়ে করতে পারবো না।
বাবা, মার আশীর্বাদ না নিয়ে বিয়ে করলে অমঙ্গল হয়। সংসার টিকে না।

সেদিন সে হলুদ রঙের শাড়ি পরে মাথায় ফুলের মুকুট দিয়েছিল।
আমি বললাম এ কি সেঁজেছো এ তো পয়েলা ফাল্গুনের সাঁজ।
সে লাজুক হেসে বলেছিল "তুমি বুঝো না,আজ তো আমার গাঁয়ে হলুদ"

বিয়ের কথা উঠলেই ও কল্পনায় ডুবে যেত, মহা ধুমধাম করে আমাদের বিয়ে হবে। কোন কমিনিউটি সেন্টারে না বাড়িতে হতে হবে। কমিনিউটি সেন্টারে বিয়ে ভাল না সবাই আসে না। যায়গায় অল্প
আরো বলতো বিয়ে বাড়ির গেট টা হতে হবে পাহাড়পুরের রতন বেকারিদের দুর্গাপূজোর গেট টির মত বড়।
বিয়ের মন্ডপ টা হতে হবে সেরোকম যেন অর্চিতার বিয়ের মন্ডপটার চেয়েও সুন্দর হয়।
আমি জিজ্ঞেস করি আর বাসর ঘর?
যাও লজ্জা করে না বুঝি বলে মুখ লুকাতো।

আজ আর এসব ভেবে লাভ নেই।
সব সময় কল্পনায় বিভোর, হাসি খুশি পুতুল টা আমার কেমন জানি হয়ে গেছে।
গত কয়েক দিন থেকে হাসিখুশি ভাব টা মরে গেছে, দশমির দিনে দেবী ভাষানের সময় মা, মাসিদের মুখ টা যেমন মলিন হয়ে যায় ঠিক তেমন, হাসে না কথা বলে না।

ওর এই রুপ টা আমি কখনো দেখি নি রিক্সা থেকে নামার সময় বলল হয় কালকেই নয়তো কোন দিনেই নয়।
আসলে কি জানেন ওরা আমারদের স্বপ্ন গুলো মেরে ফেলার জন্য কোন ত্রুটি রাখে নি।

জানি আজকের পর আগামীকাল আমার বাবা, দাদাদের নামে থানায় কেস দায়ের হবে আমাকে এক নাম্বার আসামি করে।
রাতুলের নাম টাও দিবে বোধহয় ওর সাথেই তো সকাল সন্ধা উঠবস আমার ওরা জানে।
খুব খারাপ খারাপ লাগতেছে জানেন আমার জন্য শুধু আমার জন্যই আমার বৃদ্ধ বাবাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে, দুই একটা লোকাল পেপারে নিউজ আসবে নাবালিকা অপহরণের।
বিনা অপরাধে রাতুল টাকেও অপহরণকারী হতে হবে।
দাদাদের সামনে তো কখনোই দাঁড়াতে পারবো না ওরা আমাকে পেলে জানে মেরেই ফেলবে বোধহয়!
কিন্তু কিছু করার নাই জানেন যা করার আজকে রাতেই করতে হবে।
ও বলে দিয়েছে হয় আজকে নয়তো কোন দিনেই নয়।
ঠিক একটায় লগ্ন এগারটায় বর আসবে যা করার এগার টা থেকে ১ টার ভিতরেই করতে হবে।
জানেন আমার আর কোন উপায় নেই।
দেয়ালে পীঠ ঠেকে গেছে।

তুমি একটিবার চাইলেই

জানো ভূমি তুমি চাইলেই, শুধু তুমি একটি বার চাইলেই হতে পারতে আমার সব কিছুর ভূমিকা।

তুমি একটি বার চাইলেই হতে পারতো কত কিছু!
এসাথে দেখা হত কত ভোর, শেষ বিকেলের সূর্যাস্ত।

তুমি চাইলেই গোধূলি তে গোনা হত একসাথে, কত সহস্র ঘর ফেরা পাখি।

শুধু একটিবার তুমি চাইলেই কত পুর্ণিমার রাতে হতো রাত জাগা!

ভেবে দেখেছো কি কখনো?

তুমি একটি বার চাইলেই গুনতে পারতাম অমাবস্যায় হারিয়ে যাওয়া দু একটা তারা।

জানি তুমি চাওনি কখনোই।
চাওয়াচাওয়ি হয়নি কখনোই।
আর হবেও না কখনো, ভোরের সূর্যোদয়, পুর্ণিমারাত, গোধূলিতে পাখিদের ঘরে ফেরা।

মন পোষাক

মন পোশাকের রং বদলেছে বহুবার!
কোনটাই স্থায়িত্ব পায়নি।
ফাগুনের আগুনে রঙ্গিন হয়েছে
চৈত্রের তাপে ধূসর হয়েছে
একের পর এক রঙ নিয়েছে বার বার!
কোন এক বর্ষায় কার জানি অপেক্ষায়
রঙ বদলেছিলো আরেকবার
ধবে ধবে সাদা রং!
অন্য এক সময় অন্য এক ঋতুতে পরেছিলো কালো রঙ
কার শোকে এ বেশ হে মহামান্য মন?
উত্তর আসেনি।
প্রশ্ন লিখে যাই সাদা চকে কালো দেয়াল ধরে একের পর এক লাইন।

একটি একটি আত্মহত্যার আত্ম কথা

আমি মারা যাচ্ছি এটাই সত্য, এটাই বাস্তব।
হ্যাঁ মরে যাচ্ছি, আর কিছু চাওয়া পাওয়ার নেই। তাহলে বেঁচে থেকে কি লাভ?
চাইলে আরো আগেই মরে যেতে পারতাম কিন্তু মরি নি, এবার মরে দেখিয়ে দিতে চাই।

আমি এর আগে ভেবে দেখেছি কিভাবে মরা যায়, ভেবেই চলেছি তখন, তাই এর আগে কখনো মরা হয়নি।

এবার ভাবি নি, ভাববো না।
বাজার থেকে কীটনাশকের বোতল টা যেটাতে লেখা ছিল "পাকুস্তলিতে বিষক্রিয়া ঘটিয়ে বালাইনাশকে অতি কার্যকর"

কিচ্ছুক্ষণ আগে ঢকঢক করে শেষ করেছি। ঠিক সেই ফেন্সিডিলের বোতল টির মত কিছুদিন আগে রাশু খাইয়ে বলেছিল ঢকঢক করে ঢালি দে, এই নে পুরিয়া এবার দুইটা বারি দে দুনিয়াটা নীল হয়ে যাবে।

কিছুই ত হচ্ছে না, তাহলে কি বিষেও ভেজাল?

পাঁচমিনিট হয়ে গেল, ঘামাচ্ছে খুব! মাথাটাও ঝিমঝিম করতেছে। তাহলে কি আমি এবার মারা যাচ্ছি? হ্যাঁ আমি সত্যি সত্যি মারা যাচ্ছি।

মারা যাবোই তো এই দুনিয়ায় কে আছে আমার? কার জন্য বাঁচবো? বেঁচে কি লাভ?
আমার জন্য কেউ কি অপেক্ষায় আছে? না থাকবে? না, কেউ থাকবে না। আমি মারা যেতে চাই।

সেদিন ও চলে গেল, বাড়িতে গেলাম। সারাদিন না খেয়ে থাকলাম কই কেউ তো বলল না খেয়েছি কিনা? মা ও ত জিজ্ঞেস করতে পারতো একবার? করেনি।

আচ্ছা সে ওভাবে চলে যাবার পর,তার কি আমার কথা একবার মনে পরেছিল?  কিছু কি ভেবেছিল আমাকে নিয়ে?
না ভাবেনি একবারো।

আসলে কেউ নেই আমার, বেঁচে থেকে কি লাভ? মরেই যাবো আজ। সত্যি সত্যি মরে যাবো।

কতক্ষণ হলো? দশ মিনিট?  না দশ মিনিট হয়নি এখনো। আট মিনিট ৩০সেকন্ড।

খুব বমি পাচ্ছে, মাথা ঘুরাচ্ছে। আমি মারা যাচ্ছি।

আমি মরে গেলে কেউ কি কাঁদবে? হ্যাঁ মা কাঁদবে বেচারি সারাজীবন শুধু কষ্টই পেয়ে গেল, আমি মরার পর খুব কাঁদবে।
বাবা? কোনদিন কাঁদতে দেখিনি তাকে, ও না কেঁদেছিল,  সব গুলিয়ে যাচ্ছে এখন।

প্রথমবার বমি হলো ওটা খাবার ১০মিনিট পর।

হ্যাঁ বাবাকে একবার কাঁদতে দেখেছিলাম, দিদির বিয়ের সময়। দিদিকে যখন বিয়ের মন্ডবে সম্প্রদান করেছিলো তখন গামছা দিয়ে চোখ মুছতে দেখেছিলাম আমি। খুব ছোট ছিলাম  তখন বাবার কাছেই বসে ছিলাম এখন পরিস্কার মনে পরতেছে। বাবা গামছা দিয়ে চোখ মুছেছিল।
আর তার পর দিন? তারপর দিন ভোরবেলা যখন আমার একমাত্র দিদিকে বিদেয় দেওয়া হয় তখন কি কাঁদেনি? মা, মাসিরা যখন গলা জোড়াজোরি করে কেঁদেছিল তখন বাবা ঘরের দরজা বন্ধ করে কি করেছিল? তখন ছোটছিলাম তখন না বুঝলেও এখন ঠিক বুঝতে পারি।

হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেছে মনে হয়।
আমার এখন ঠান্ডা লাগতেছে খুব।
সব কিছু নীল দেখাচ্ছে, দূরে রাস্তায় হেটে, সাইকেলে যাওয়া লোক গুলোকে আবছা দেখাচ্ছে।

খুব শীর্গ্র মরে যাচ্ছি বোধহয়। মরতেই তো চাই। মরার জন্যই তো বিষ খেয়েছি এখনি মরলেও যা আরেকটু পরে মরলেও তা।

আরেকবার বমি করলাম, কতক্ষণ হয়েছে জানি না।

দিদির কথা মনে পরতেছে এখন খুব, সেবার যখন খুব জ্বর হলো এসএসসি পরীক্ষার আগে। দিদি এসেছিল আমার জ্বরের কথা শুনে। সারারাত মাথায় জল ঢেলেছিলো। সারারাত থেমে থেমে বমি করেছিলাম। যখন বমি আসতো, দিদি আমার মাথা টা তুলে ধরে রাখতো। সারারাত ঘুমায়নি সেদিন।

জ্বরের ঘোরে সারারাত প্রলাপ বুকেছিলাম। দিদি সেই সব নিয়ে ঠাট্টা করে আমাকে লজ্জা দিতো। আমি লজ্জা পেয়ে ওর কোলে মুখ লুকাতাম।

আজ আমি মরে গেলে দিদি কি সেই কষ্ট সইতে পারবে? আমি তার একমাত্র ভাই।
মরতে বসেছি।

মনে হয় চেতনা হারিয়েছিলাম!
সন্ধা হয়ে গেছে কি? যখন ওটা খাই তখন বিকেল চারটা।
এখন পুকুরের ওই পার টা ভাল করে দেখতে পাচ্ছি না।
রাস্তায় লোক চলাচল কমে গেছে।

আমি মরে যাচ্ছি, আমি মরে যাচ্ছি।
আচ্ছা আমি কি সত্যি সত্যি মরে যাচ্ছি?

আমি যদি মরে যাই তবে কি হবে?
পুকুরপাড়ের এই খেজুড় গাছ টায় যে বড় বড় খেজুর ধরে, কয় মাস পরেই যে ইয়া বড় বড় হবে আমি কি আর খেজুর খেতে পারবো না?

ধুর আমি এসব কি ভাবতেছি? আমার মাথা ঠিক আছে তো?

মার কথা খুব মনে পড়তেছে, আমি মরে গেলে মার খুব কষ্ট হবে, গতবার রাতুল টা যখন পানিতে ডুবে মারা গেল ওর মার কি কান্না! রাতুলের বুকের উপর ঝাঁপিয়ে ওর মা কাঁদতেছিল "একবার কথা কয়েক বাপ, একবার মোক মা ডাকেক, রাতুলডে, মোর সোনা বাপ"

আমার মা ও তো কাঁদবে। আমার কি এটা ঠিক হচ্ছে?
আর দিদি?

বাবা তো কারো সাথে কথাই বলবে না, দিদিকে বিদায় দিয়ে যেভাবে সেদিন কারো সাথে আর কথা বলেনি।

আমি মরে গেলে লালুকে তিন বেলা ভাত খেতে দিবে কে?

মা তুমি কই? বাড়ি থেকে বের হবার সময় তুমি কেন আমাকে আটকালে না? মা তুমি কই?
সব দোষ তোমার। তুমি আটকালে আমি কি বিষ খেতে পারতাম।  মা তুমি কই?

তুমি অন্য দিনের মত আজ আমার বিছানা ঠিক করে দিলে না কেন? বিছনা ঠিক করতে আসলেই তো আমার বালিশের নিছে বিষের বোতল টা পেতে।

মা তুমি কই, আমি মরতে চাই না মা।
মা আমাকে বাঁচাও....

আমার গ্রাম্য বালিকা প্রেমিকা

আমার গ্রাম্য বালিকা প্রেমিকা কখনোই বলেনি "আমি তোমাকে ভালবাসি "

"ভালবাসি" উচ্চারণ করার আগেই লজ্জায় মরে যেত সে শতবার।

গল্পের গল্প

তারপর একদিন ছাইচাপা আগুনের মত জমানো ক্ষোভ গুলো হঠ্যাৎ করেই বিক্ষোভে রুপ নিলো। নাম হীন গল্প গুলো যারা এতদিন এলোমেলো নিরীহ ভাবে ঘুরে বেড়াতো এ গলি, ও গলিতে।
তারাও দাবি নিয়ে রাজপথ দখল করে বসলো,  আমাদের নাম দাও, শরীর দাও। চরিত্র গুলো আমরণ অনশনে বসলো দাবি একটাই তাদের আকার দাও, দিতে হবে পরিচয়।
অকাল গর্ভপাতে মৃত গল্পের আত্মরাও এসে হাজির সে বিক্ষোভে, তাদের দাবি এই অন্যায়ের বিচার চাই, তাদের দিতে হবে পুনজন্ম আবার!

ব্যার্থ প্রণয়ে গর্ভধারণ, তারপর অকাল গর্ভপাতে মৃত কবিতা গুলো নিরবে দাঁড়িয়ে রইলো বিক্ষোভের আরেক পাশে!

আন্দোলন দমনে শহরজুড়ে আর্মি এলো, বলবত হলো সান্ধ আইন।
শত অত্যাচার, প্রলোভনেও  বিক্ষোভ কমলো না, আন্দোলন থামলো না।

দাবি একটাই নাম চাই, শরীর চাই, আকার চাই।

তোমরা অপূর্ণাঙ্গ, তোমাদের এই অবস্থায় বের করে আনলে তোমরা শুধু বোঝা হবে সবার। শত শত কলাম লিখলো দৈনিকে, টিভিতে টকশোতে গলা চড়ালো ভাড়াটে যত বুদ্ধিজীবী গন।

তবুও বিক্ষোভ কমলো না, আন্দোলন থামলো না।
অবশেষে মেনে নেওয়া হলো সব দাবি শর্ত একটাই কর্তার ইচ্ছায় একে একে নাম, আকার, শরীর পাবে সবাই।

প্রথম জন্ম পেল একটি কবিতা "বৈশাখ এলেই আমি উত্তেজিত হয়ে যাই"।

আমাদের ঈশ্বর

গতরাত টা কাটিয়ে এলাম ঈশ্বরের সাথে।
কলা,দুধ নারিকেল ফল প্রসাদ ভাগে জুটেছিলেও বেশ।
শহরের সবচেয়ে বড় মন্দিরে তিনি আশীর্বাদ করলেন পূঁজা শেষে "আরো বড় হও"।
আমি জিজ্ঞেস করলাম এখনোই আকাশ ছুঁয়ে যায়,  মন্দির আর কত বড় হবে প্রভু?
চুপ কর মূর্খ, যত বড় মন্দির ততোই নাম, ততোই বাড়বে মোর আরাধনা, প্রভাব।
সাহা পাড়ার ধনীদের গৃহে পূঁজায় তুষ্ট হয়ে বর দিলেন, "ধনবান,জোশবান হও!"
ভয়ে ভয়ে বললাম, প্রভু এদের তো অনেক আছে, যাদের নেই তাদেরো দাও।
রুষ্ট চোখে মুখ ফিরিয়ে প্রভু ঈশ্বর চলিলেন এবার নন্দীদের ভাঙা গৃহে।
অল্প প্রসাদে, সল্প আয়োজনে বেজার ঈশ্বর চলিলেন মাঝ রাজ পথ ধরে।
জিজ্ঞাস করলাম, প্রভু তোমার এ কেমন বিচার?
রাগত স্বরে তিনি বলিলেন মূর্খ মানব, অকৃতজ্ঞ হতে পারিস তুই, আমি ঈশ্বর অকৃতজ্ঞ নই।
যারা আমার প্রচার করেছে, যাদের জন্য টিকে আছি তাদের প্রাপ্য আমি ঠিকই দেই।

রানী পদ্মাবতীর চন্দ্রহার

রাজেশ্বরী জুয়েলার্স এর প্রোপাইটার রাজেন্দ্র আগারওয়াল বাবু ব্যাথাতুর মুখে লোলুপ দৃষ্টিতে একবার আমার দিকে আরেকবার রতন স্বর্ণকারের দিকে তাকাচ্ছেন।

অনেকক্ষন আমাকে চুপচাপ থাকতে দেখে হাত কচলাতে কচলাতে বললেন,  " আমি বলেছিলাম কি রায়বাহাদুর সাহেব এরোকম জিনিস আর তিনটে কোথাও পাবেন না, একবার ভেবে দেখুন দু, দুটো চন্দ্রহার এভাবে নষ্ট করা কি ঠিক হবে? আপনি চাইলে আমি এ দুটোর সমান সোনা আপনাকে মেপে দিচ্ছি অথবা  বাজার দর অনুযায়ী নগদ টাকা চান তো আপনাকে নগদ দিচ্ছি। তবুও আমাকে এ দুটো গলাতে বলবেন না প্লিজ। এ দুটো এভাবে নষ্ট করলে পাপ হবে। এ যে বড় অমূল্য জিনিস।"

হুকুমের অপেক্ষায় মাথায় কাঁচাপাকা উষ্কখুষ্ক চুল, পান খাওয়া মুখ হা করে রতন সেকরার একবার আমার দিকে আরেকবার মালিকের দিকে তাকাচ্ছে।

আমার মাথায় তখন চলতেছে অন্য হিসেব,
এই দুটো চন্দ্রহারের একটির জন্য আমার প্রপিতামহের বংস প্রায় নির্বংশ হয়েছিলো।
আর আজ আমার? কেউ নেই আমার মৃত্যুর পর ভিটেমাটিতে প্রদীপ জ্বালানোর।

আমি নরেন্দ্রনারায়ণ রায়বাহাদুর, আমার পিতা নগেন্দ্রনাথ রায়,তাঁর পিতা খগেন্দ্র নাথ রায়, তাঁর পিতা ছিলেন কৈলাশনারায়ন রায় বাহাদুর।

নামের আর উপাধির বহর দেখে নিশ্চই বুঝতে পারতেছেন আমি রায় বংশীয়।
আমি রায়বাহাদুর খেতাপ প্রাপ্ত নই, সেই ব্রিটিশ সময়ের বংশীয় জৌলুশ, রস বহু আগেই ফুরিয়ে গেছে ব্রিটিশ দের সাথে সাথেই। রয়ে গেছে শুধু বংশীয় গৌরব আর নাম গুলো। একে একে বংশীয় গৌরব ও তলানি তে টেকে গেলে আমি নামের সাথে রায়বাহাদুর লাগিয়ে তা রক্ষা করার শেষ চেস্টা করি!

আমার ঠাকুমা অহল্যা দেবী। শক্তপোক্ত নারী ছিলেন। যিনি একসময় একাই, এক হাতে গোটা পরিবার সামলিয়ে পিতৃহীন
আমার বাবা, পিসিদের মানুষ করেছিলেন,  বিয়ে দিয়েছলেন।

আমার তখন সবে নতুন বিয়ে হয়েছে,  আষাঢ় মাসের কোন একদিন তুমুল বর্ষা পরেছে। দিঘী,পুকুর,পুষ্কুনি ডুবে গেছে। পূর্ণিমা রোড টা তখন কাঁচা ছিল বন্যার জলে ভেসে গেছে।
এমন একদিনে যখন শশুড় বাড়ি যাওয়ার রাস্তাও বন্ধ। আমাদের মানে আমাকে আর আমার বউ সেতাকে একটা গল্প শুনিয়েছিল। রানী পদ্মাবতীর চন্দ্রহারের গল্প!

'আমার শশুর তখন সবে রায়বাহাদুর খেতাপ পেয়েছেন, সাথে জমিদারি। কি ছিল না আমাদের? আস্তাবলে চার চারটে ঘোড়া, ঘোড়ার গাড়ি, গোয়াল ভরা গরু, হাজার বিঘের জমিদারী। তোর ঠাকুরদাদা কলকাতায় থেকে কলেজের পড়াশোনা শেষ করলে। আমাকে তোর ঠাকুরদাদার জন্য এগারো কুঁড়ি এক টাকা পণ দিয়ে ঘরের বউ করে আনলো। দেবেন্দ্র টা তখনো ছোট (দেবেন্দ্র নারায়ণ রায় ছিলেন আমার আমার ঠাকুরদাদার একমাত্র ছোটভাই) ওকেও কলকাতা পাঠানো হলো লেখাপড়ার জন্য।
তোর ঠাকুরদাদা এখানেই থেকে গেল বাবার জমিদারী দেখাশোনা করার জন্য।
এদিকে ইংরেজ দের নিমিন্ত্রন রক্ষা আর জমিদারীর কাজে আমার শশুড়মশাই প্রায়শই কলকাতা যেতেন। ছোট ছেলের জন্য নিয়ে যেতেন বাগানের ফল, আমার হাতের তৈরি আচার আর শুকনো খাবার।
আসার সময় কখনো নিয়ে আসতেন তোর ঠাকুরদাদার জন্য বিলেতি স্যুট, কোট, আমার জন্য কাস্মীরি শাল, শাড়ি।

এমনি একবার কলকাতা গেলেন জমিদারী কাজে, আমার শাশুড়ি অনেক আগেই মা হতে গিয়ে মারা গিয়েছিলেন তারপর শশুড়  আর বিয়ে করেননি। আর আমার শশুরের কোন মেয় ছিল না। তার জন্যই বোধহয়, আমাকে খুব ভালবাসতেন। সে বার আমার জন্য নিয়ে আসলেন বাইশ ভরী ওজনের সোনার চন্দ্র হার। আমার হাতে দিয়ে বললেন পরে দেখাও তো মা কেমন লাগতেছে আমার মা কে রানী পদ্মাবতীর চন্দ্রহার পরে।

যেদিন বাড়িতে চন্দ্রহার ডুকলো সেদিনি সুস্থ সবল ঘোড়া দুটো মুখ থুবড়ে পরে মারা গেলো।
গাঁয়ের কারো গোঁয়ালে খূড়াই ধরলো না কারো গরু মরলো না কিন্তু আমাদের গোঁয়ালের অর্ধেক গরু খূঁড়াই রোগে মরে গেল একমাসে।
গ্রীষ্মে দেবা বাড়িতে আসলো ঘুরতে, এক বিকেলে বন্ধুদের সাথে নদীপারে ঘুরতে গিয়ে বাড়ি ফেরার সময় চরকপরে আম বাগানে মরে পরে রইলো। আমার দেবা রে, দেবা। আমার সোনা চান.........

আমাদের জমিদারী চলে গেল তার পরের বছর।

সুখের সংসার উচ্ছন্নে গেল, তোর বাবা আর তোর পিসি এল আমার কোল জুড়ে একসাথে।
তার কিছুদিন পর তোর ঠাকুর দা অসুখে পরলো, মরন অসুখ।
কোন ঔষধেই কাজ হয় না। দিন কে দিন লোক টা নিস্তেজ হতে থাকলো। জ্বর আর ছাড়লো না।
আমার শশুড় ভোরের আগেই বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় ফিরে দুই তিন পর মাঝ রাতে।
কোথায় যায়নি? সৈয়দপুর, রংপুর, ঢাকা, চট্টগ্রাম, কলকাতা যে যেখানেই বলেছে ওখানকার কবিরাজ ভাল ওর ঔষধ খেয়ে অমুক ভাল হল, সেখানেই গেছে।

দিন কে দিন আমার শশুড় মশাইও ভেঙে পরলো, সব আশা মিশে গেছে তাঁর। কোথাও যান না, কিছু বলেন না। দুই হাঁটুর মাঝে মাথা দিয়ে কাঁঠাল কাঠের পিঁড়িতে বসে থাকেন।
বাচ্চারা এমনকি বড় মানুষ গুলোও আমার শশুড় কে বলতে শুরু করলো তিন মাথিয়া বুড়া। দুই হাঁটুর মাঝে মাথা সহ তিন মাথাই মনে হত দূর হতে দেখলে।

অবশেষে একদিন উত্তর হতে এক তান্ত্রিক ফকির এলো,  বলল মা এক ঘটি জল দাও বড্ড তেষ্টা পেয়েছে।
তোর ঠাকুরদাদা তখন আঙ্গিনায় খাঁটে সুয়ে ছিল, তার পাশে আমার শশুড় কাঁঠের পিঁড়িতে বসে। তাঁকে দেখে বলল " তোমার ছেলে বাঁচবে না, তাকে লন্ডন নিয়ে গেলেও  বাঁচবে না। যে চলে যাবে তাকে যেতে দাও যারা আছে তাদের আগলে ধরো। তাদের রক্ষা করো।"

কি বলতে চাও তুমি? শশুড় বাবা মাথা তুলে হুংকার ছাড়লেন।

ফকির একটুও বিচলিত না হয়ে বলল, " তুই পাপি কলকাতা হতে রানী পদ্মাবতীর অভিশপ্ত চন্দ্রহার কিনেছিস, তার জন্য তো এই দোষা যদি বাঁচতে চাস বংসের প্রদীপ রক্ষা করতে চাস আরেকটা চন্দ্রহার বানিয়ে এক হাজার একটি স্বর্ণমুদ্রাসহ কলসে ভরে সপ্তমুনী বন দিয়ে পুর্ণিমা রাতে ঈশাণ কোনে মাটিতে পুতে দিস।

অবশেষে নিরুপায় হয়ে আমার শশুড় তাই করলো। জমি বিক্রি করে, জমানো টাকা,অলংকার ভাঙ্গিয়ে কলকাতার সেকরার দের দিয়ে  আরেকটি চন্দ্রহার বানিয়ে, এক হাজার একটি স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে আসলো।
সেই তান্ত্রিক কে খুঁজে বের করে তার মতে সব করা হলো।
তিন দিনের রাতে তোর ঠাকুর দা মারা গেল।

শোক সইতে না পেরে আমার শশুড় সে বছরেই মারা গেলেন।"

রানী পদ্মাবতীর চন্দ্রহার

২য় অংশ

এভাবেই আমার ঠাকুমার গল্প অর্থাৎ আমাদের পরিবারের ইতিহাস বলা শেষ হয়।
গল্প শেষে আমার ঠাকুমা আমাকে বার বার নিষেদ করেছিলেন, আমি যেন সেই চন্দ্রহার দুটো খুঁড়ে বের না করি।


সময়ের ফেরে সেই জমজ চন্দ্রহার, স্বর্ণ মুদ্রার কথা ভুলে যাই।

সেতার কোলে আমার এক ছেলে, এক মেয়ের জন্ম হয়।
ততোদিনে আমার ঠাকুমা গত হয়েছেন।
আমাকে শাসন,দেখে রাখার মত কেউ ছিল না আর। বাবা,মা আগেই গত হয়েছিলেন।

নেশা, জুয়া, নারী মোহে ডুবে যাই।
সেতাকে ধোঁকা দিয়ে দ্বিতীয় বউ ঘরে তুলি।
বলতে গেলে বলা যায়,বাধ্য হয়েই দ্বিতীয় বিয়ে করি।
সে আমার আরেক পাপের ইতিহাস।

দ্বিতীয় বউ ঘরে তোলার পর সেতা দুইবার আত্মহত্যার চেস্টা করে।

এরপর দ্বিতীয় বউকে ছেড়ে দেই।
দ্বিতীয় বউকে ছাড়তে আর সংসার টেকাতে কেস মামলায় জড়িয়ে যাই।

কেস চালাতে গিয়ে আর আমার বেপরোয়া জীবন যাপনে বাপ দাদার দিয়ে যাওয়া সম্পদের মাঝে শুধু তিন একর জমির উপর আমাদের বাড়িটি টিকে থাকে।

ভাদ্রমাসের কোন একদিন, তালপাকা গরম পরেছে। বৈঠক ঘরে বসে আছি। এই সেই বৈঠক ঘর, একসময় যে ঘরে আমার প্রপিতামহ কৈলাশনারায়ন রায়বাহাদুর জমিদারি চালাতেন, কলকাতা থেকে আসা নর্তককীদের মুজরা বসত।
কলকাতা থেকে আসা উকিল, ব্যবসায়ী লোকদের আপ্যায়ন করা হত এই ঘরে বসেই।

আমি এই ঘরে মাঝে মাঝে এসে সময় কাটাই, বাড়ির একমাত্র টিকে যাওয়া কাজের লোক অনিলের সাথে গল্প করি, হুকুতে তামুক খাই।
কারন যাওয়ার মত কোন যায়গা নেই।
অথবা যাওয়ার সামর্থ্য নেই!

বসে বসে হুকুতে তামাক খাচ্ছি। এমন সময় অনিল আসলো।
"হুজুর পন্ডিত মশাই এসেছেন"
নামে পন্ডিত! কাজেও পন্ডিত!
আমার পরামর্শ ও ধারের অর্থ যোগান দাতা।
আমার বাপ দাদার অর্ধেকের বেশি সম্পতি বাঁধা পড়েছে অথবা দলিল হয়েছে এই পন্ডিতের নামে।
পন্ডিত নাম টা দেওয়া আমারি আদতে একজন ব্যবসায়ী।
জানি আজকে আসবেন ধারের টাকার সুদের জন্য।

ঘরে প্রবেশ করে প্রণাম করে মুস্কি হাঁসি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন "কেমন আছেন রায়বাহাদুর সাহেব? আপনাকে আজকাল বাইরে দেখাই যায় না। তাই এদিক দিয়ে যেতে যেতে মনে হলো দেখা করেই যাই"

নিছক বিনয় প্রকাশ না খেয়াল করলেও বিনয়ের নগ্নভাব টা বুঝা যায়, বিরক্তিকর।
এই কে আছিস পন্ডিত মশাইকে কে জলখাবার দিয়ে যা বলে কথা পারলাম।
আপনি যে জন্য এসেছেন তা আজ হবে না।
আপনাকে অন্য আরেকদিন কষ্ট করে আসতে হবে নতুবা আমিই বের হবো কোনদিন।

না না তা লাগবে না, আমিই আসবো, আপনার এই অসুস্থ শরীর নিয়ে বের হবার প্রয়োজন নেই। আজ তাহলে আমি উঠি।

ব্যবসায়ীর চোখ! আমাকে আরাম কেদারায় আধশোয়া দেখে ধরে নিয়েছেন আমি অসুস্থ! অথবা জেনেবুঝেই চাল টা চাললেন। আমি কবে গিয়ে তার সাথে দেখা করবো না করবো তার চেয়ে নিজে আসার সুযোগ টা হাত ছাড়া করলেন না।

চা, তামুক ফেলেই পন্ডিত দৌড় দিলেন!

আমার ঠাকুমা বলে গিয়েছিলেন, "যত দিন যায়, যায় ভাল আসে খারাপ"

আমারো তাই হলো। সংসারের অভাব বাড়তেই থাকলো আমার বাইরে যাওয়া বন্ধ করেছি হাউস রং সব বন্ধ তবুও অভাব বাড়তেই থাকলো।

এদিকে বাড়ির সাথে আম বাগানখানি পন্ডিতের কাছে বন্ধ, কাল টাকা না দিতে পারলে পরশু দলিল করে দিতে হবে।

এমন এক সন্ধায় বাড়ির আম বাগানে হাটতেছি, হঠাৎ মনে হল কে যেন সামনে দাঁড়িয়ে ঠাকুমা? না কেউ নেই।

এর কিছুদিন পর রাতে ঠাকুমাকে স্বপ্নে দেখলাম আমাকে আর সেতা কে রানী পদ্মাবতীর চন্দ্রহারের গল্প শুনাচ্ছেন!

আসলে কি তা স্বপ্ন ছিল? না আমার অবচেতন মনের ভাবনায় যা চলতেছিলো তাই'ই?

এর মাঝে পন্ডিত দুবার এসে ঘুরে গেছে। একবার দেখা করে বলেছি একটু দেরি হবে।
আরেক বার অনিল কে দিয়ে বলিয়েছি আমি অসুস্থ! দেখা করতে পারবো না।
যদিও আমি কথা বলতে অসমর্থ এমন অসুস্থ হয়নি কখনো।

আমার ছেলে অমলেন্দু কে পড়াশোনার জন্য কলকাতায় পাঠিয়েছি একবছর হলো, মেয় কল্পনার এবার ১৩ তে পড়লো।
মেয়ের বিয়ের খরচের ভাবনা, ছেলের কলকাতার পড়াশোনার খরচ আমাকে জর্জরিত করে ফেলে।

সব দিক থেকে অভাব আর অভাব।
শেষে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত টি নিয়েই ফেলি। যদিও সব কিছুই, ভয়,অভিশাপ জানতাম।

এর কিছুদিন পর ঠিকই আম বাগানের বুজে যাওয়া কুয়ো খুড়ে বুড়ো অনিল আর আমি জোড়া চন্দ্রহার খুঁজে বের করি।

ঠাকুমার সতর্কবাণী কিংবা রানী পদ্মাবতীর অভিশাপের ভয়েই হউক আমি চন্দ্রহার গুলোতে হাত দেই নি। ওগুলো সিন্দুকে তুলে রাখার পর স্বর্ণ মুদ্রাগুলো গলিয়ে দেদারচ্ছে খরচ করি। অনেক দিন পর ফিরে আসে সেই পুরনো রাত!

এরপর তিন মাসে তেমন কিছু ঘটেনি।
বছর শেষ হবার আগেই ভাল ঘর দেখে মেয়ের বিয়ে দেই ছেলে ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট।

এরপরেই ঘটতে শুরু করে অঘটন গুলো।
আমি প্রায় প্রতিরাতেই স্বপ্নে, না বরং বলা চলে দুঃস্বপ্নে রানী পদ্মাবতী কে দেখতে পাই!
তার আত্মবিলাপ, জমিদারী, রুপ, করুন পরিণতি। একসময় আমি কোন টা স্বপ্ন কোন টা বাস্তব তা ভুলে যাই।

রানী পদ্মাবতী কে নিয়ে দেখা স্বপ্ন গুলো নিয়ে বলবো অন্য কোথাও।

এরপর যা ঘটেছিল আমার জীবনে তা বলি।
আমার জামাতা হঠ্যাৎ করে বিনা অসুখে মারা যায়, আমার একমাত্র কন্যা কল্পনা বিধবা হয়ে যায়।

এ শোক সইতে না পেরে আমার সহধর্মিণী, আমার প্রাণপ্রিয়া সেতা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।
এক ভোরে তার ঝুলন্ত লাশ অনিল আম বাগানে দেখতে পায়।

এর তিন মাস পর আমার একমাত্র ছেলে, আমার বংসের একমাত্র বংসপ্রদীপ অমলেন্দু কলকাতায় ট্রাম দুর্ঘটনায় মারা যায়!

কি আর বেঁচে থাকলো আমার জীবনে?
অভাব ছিল তবুও তো আমার সব ছিল!
এত অল্প সময়ে এত সব দুর্ঘটনা কি নিছকই কাকাতালীয়?

গল্পিকা

জানো গত বর্ষার আগেরবার, সেবার তেমন বর্ষা পরে নি। তবুও খাল, পুর্ণিমা রোডের নয়ঞ্জলি গুলো বৃষ্টির জলে ভরে গিয়েছিলো।
আর সেগুলো সাদা সাদা শাপলায় ভরে গিয়েছিলো, কদম গাছে কদম ফুটেছিলো কেন জানি অন্য আগের বারের চেয়ে অনেক বেশি। তোমাকে বলতেই তুমি জিদ ধরে বসলে তোমার জন্য শাপলা, কদম না নিয়ে, যেন দিনাজপুরে না আসি!
তোমার জন্য শাপলা কদম নিয়ে যেতে যেতে আরেক মজার ঘটনা! তোমাকে তো বলেছিলাম তাই না?
যাই হউক এবার যেটা বলার জন্য এত ভূমিকার অবতারনা! আমি লিলিমোড়ে বাস থেকে নামলাম তুমি বরাবরের মতই লেট!
আধা ঘন্টা দেরিতে এসে রিক্সা থেকে নেমে বললে হাদারাম! সত্যি সত্যি শাপলা নিয়ে এসেছে! আমি তো মজা করেছিলাম!
শাপলা গুলো হাতে নিয়ে কদম গুলো ভ্যানিটিব্যাগে রাখতে রাখতে বললে, কোথায় যাবে, কি জন্য এসেছো বলো।
আমি ভয়ে ভয়ে বলেছিলাম, একটা বই আর একটা জুতো কিনবো!
গাঁধা একটা জুতো দিয়ে কি করবা? পায়ে পরবা না গলায় ঝুলাবা?
এরপর জেলখানা মোড়ের দোকান গুলো থেকে তুমি পছন্দ করে জুতো কিনে দিলে।
না, একটা না এক জোড়াই!
হ্যাঁ আমি সেই জুতো জোড়াটার কথায় বলতেছি! জানো গতকাল সেই সেন্ডেল জোড়ার বাঁ পায়েরটার বাম পাশের ফিতে টা ছিঁড়ে গেছে।

ভুলতেছি আমি ভুলের রাজ্যে। তুমি এবং তোমাকে! ভুলে যাচ্ছি চিহ্ন, ভুলে যাচ্ছি চেহেরা। ভুলছি, কি ভুল করছি তাতে! ভুল হচ্ছে দিন রাত, ভুল করতেছ...