আমি মারা যাচ্ছি এটাই সত্য, এটাই বাস্তব।
হ্যাঁ মরে যাচ্ছি, আর কিছু চাওয়া পাওয়ার নেই। তাহলে বেঁচে থেকে কি লাভ?
চাইলে আরো আগেই মরে যেতে পারতাম কিন্তু মরি নি, এবার মরে দেখিয়ে দিতে চাই।
আমি এর আগে ভেবে দেখেছি কিভাবে মরা যায়, ভেবেই চলেছি তখন, তাই এর আগে কখনো মরা হয়নি।
এবার ভাবি নি, ভাববো না।
বাজার থেকে কীটনাশকের বোতল টা যেটাতে লেখা ছিল "পাকুস্তলিতে বিষক্রিয়া ঘটিয়ে বালাইনাশকে অতি কার্যকর"
কিচ্ছুক্ষণ আগে ঢকঢক করে শেষ করেছি। ঠিক সেই ফেন্সিডিলের বোতল টির মত কিছুদিন আগে রাশু খাইয়ে বলেছিল ঢকঢক করে ঢালি দে, এই নে পুরিয়া এবার দুইটা বারি দে দুনিয়াটা নীল হয়ে যাবে।
কিছুই ত হচ্ছে না, তাহলে কি বিষেও ভেজাল?
পাঁচমিনিট হয়ে গেল, ঘামাচ্ছে খুব! মাথাটাও ঝিমঝিম করতেছে। তাহলে কি আমি এবার মারা যাচ্ছি? হ্যাঁ আমি সত্যি সত্যি মারা যাচ্ছি।
মারা যাবোই তো এই দুনিয়ায় কে আছে আমার? কার জন্য বাঁচবো? বেঁচে কি লাভ?
আমার জন্য কেউ কি অপেক্ষায় আছে? না থাকবে? না, কেউ থাকবে না। আমি মারা যেতে চাই।
সেদিন ও চলে গেল, বাড়িতে গেলাম। সারাদিন না খেয়ে থাকলাম কই কেউ তো বলল না খেয়েছি কিনা? মা ও ত জিজ্ঞেস করতে পারতো একবার? করেনি।
আচ্ছা সে ওভাবে চলে যাবার পর,তার কি আমার কথা একবার মনে পরেছিল? কিছু কি ভেবেছিল আমাকে নিয়ে?
না ভাবেনি একবারো।
আসলে কেউ নেই আমার, বেঁচে থেকে কি লাভ? মরেই যাবো আজ। সত্যি সত্যি মরে যাবো।
কতক্ষণ হলো? দশ মিনিট? না দশ মিনিট হয়নি এখনো। আট মিনিট ৩০সেকন্ড।
খুব বমি পাচ্ছে, মাথা ঘুরাচ্ছে। আমি মারা যাচ্ছি।
আমি মরে গেলে কেউ কি কাঁদবে? হ্যাঁ মা কাঁদবে বেচারি সারাজীবন শুধু কষ্টই পেয়ে গেল, আমি মরার পর খুব কাঁদবে।
বাবা? কোনদিন কাঁদতে দেখিনি তাকে, ও না কেঁদেছিল, সব গুলিয়ে যাচ্ছে এখন।
প্রথমবার বমি হলো ওটা খাবার ১০মিনিট পর।
হ্যাঁ বাবাকে একবার কাঁদতে দেখেছিলাম, দিদির বিয়ের সময়। দিদিকে যখন বিয়ের মন্ডবে সম্প্রদান করেছিলো তখন গামছা দিয়ে চোখ মুছতে দেখেছিলাম আমি। খুব ছোট ছিলাম তখন বাবার কাছেই বসে ছিলাম এখন পরিস্কার মনে পরতেছে। বাবা গামছা দিয়ে চোখ মুছেছিল।
আর তার পর দিন? তারপর দিন ভোরবেলা যখন আমার একমাত্র দিদিকে বিদেয় দেওয়া হয় তখন কি কাঁদেনি? মা, মাসিরা যখন গলা জোড়াজোরি করে কেঁদেছিল তখন বাবা ঘরের দরজা বন্ধ করে কি করেছিল? তখন ছোটছিলাম তখন না বুঝলেও এখন ঠিক বুঝতে পারি।
হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেছে মনে হয়।
আমার এখন ঠান্ডা লাগতেছে খুব।
সব কিছু নীল দেখাচ্ছে, দূরে রাস্তায় হেটে, সাইকেলে যাওয়া লোক গুলোকে আবছা দেখাচ্ছে।
খুব শীর্গ্র মরে যাচ্ছি বোধহয়। মরতেই তো চাই। মরার জন্যই তো বিষ খেয়েছি এখনি মরলেও যা আরেকটু পরে মরলেও তা।
আরেকবার বমি করলাম, কতক্ষণ হয়েছে জানি না।
দিদির কথা মনে পরতেছে এখন খুব, সেবার যখন খুব জ্বর হলো এসএসসি পরীক্ষার আগে। দিদি এসেছিল আমার জ্বরের কথা শুনে। সারারাত মাথায় জল ঢেলেছিলো। সারারাত থেমে থেমে বমি করেছিলাম। যখন বমি আসতো, দিদি আমার মাথা টা তুলে ধরে রাখতো। সারারাত ঘুমায়নি সেদিন।
জ্বরের ঘোরে সারারাত প্রলাপ বুকেছিলাম। দিদি সেই সব নিয়ে ঠাট্টা করে আমাকে লজ্জা দিতো। আমি লজ্জা পেয়ে ওর কোলে মুখ লুকাতাম।
আজ আমি মরে গেলে দিদি কি সেই কষ্ট সইতে পারবে? আমি তার একমাত্র ভাই।
মরতে বসেছি।
মনে হয় চেতনা হারিয়েছিলাম!
সন্ধা হয়ে গেছে কি? যখন ওটা খাই তখন বিকেল চারটা।
এখন পুকুরের ওই পার টা ভাল করে দেখতে পাচ্ছি না।
রাস্তায় লোক চলাচল কমে গেছে।
আমি মরে যাচ্ছি, আমি মরে যাচ্ছি।
আচ্ছা আমি কি সত্যি সত্যি মরে যাচ্ছি?
আমি যদি মরে যাই তবে কি হবে?
পুকুরপাড়ের এই খেজুড় গাছ টায় যে বড় বড় খেজুর ধরে, কয় মাস পরেই যে ইয়া বড় বড় হবে আমি কি আর খেজুর খেতে পারবো না?
ধুর আমি এসব কি ভাবতেছি? আমার মাথা ঠিক আছে তো?
মার কথা খুব মনে পড়তেছে, আমি মরে গেলে মার খুব কষ্ট হবে, গতবার রাতুল টা যখন পানিতে ডুবে মারা গেল ওর মার কি কান্না! রাতুলের বুকের উপর ঝাঁপিয়ে ওর মা কাঁদতেছিল "একবার কথা কয়েক বাপ, একবার মোক মা ডাকেক, রাতুলডে, মোর সোনা বাপ"
আমার মা ও তো কাঁদবে। আমার কি এটা ঠিক হচ্ছে?
আর দিদি?
বাবা তো কারো সাথে কথাই বলবে না, দিদিকে বিদায় দিয়ে যেভাবে সেদিন কারো সাথে আর কথা বলেনি।
আমি মরে গেলে লালুকে তিন বেলা ভাত খেতে দিবে কে?
মা তুমি কই? বাড়ি থেকে বের হবার সময় তুমি কেন আমাকে আটকালে না? মা তুমি কই?
সব দোষ তোমার। তুমি আটকালে আমি কি বিষ খেতে পারতাম। মা তুমি কই?
তুমি অন্য দিনের মত আজ আমার বিছানা ঠিক করে দিলে না কেন? বিছনা ঠিক করতে আসলেই তো আমার বালিশের নিছে বিষের বোতল টা পেতে।
মা তুমি কই, আমি মরতে চাই না মা।
মা আমাকে বাঁচাও....
0 comments:
Post a Comment